
সরকার পতনের দাবিতে এক দফা আন্দোলনে না গিয়ে রাজপথে কৌশলী কর্মসূচি এবং সংসদে রাজনৈতিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার মাধ্যমে সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে চায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। একই সঙ্গে জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরকারকে সহযোগিতা করার পথও খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি।
জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মকৌশলে এমন অবস্থানের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদের সাম্প্রতিক এক বৈঠকে সরকারের প্রতি সহযোগিতার পাশাপাশি ভুল সিদ্ধান্তের সমালোচনা এবং জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
দলটির একাধিক নেতা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতের সামনে এখন রাজপথে শক্তি প্রদর্শনের চেয়ে সংসদে নিজেদের রাজনৈতিক সক্ষমতা তুলে ধরার বড় সুযোগ রয়েছে। বিরোধী দলের ৭৭টি আসনকে তারা শুধু সংখ্যাগত শক্তি নয়, জনগণের দেওয়া রাজনৈতিক দায়িত্ব হিসেবেও দেখছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করা সুস্থ সংসদীয় সংস্কৃতির অংশ নয়। সরকারের কোনো উদ্যোগ ভালো হলে বিরোধী দলের সমর্থন করা এবং ভুল হলে সমালোচনা করাই গণতান্ত্রিক আচরণ।
তার মতে, কোনো সরকারি উদ্যোগে বিরোধী দলের সমর্থন থাকলেই তাকে সরকারের অনুগত বিরোধী দল বলা যায় না। কেন কোনো সিদ্ধান্তে সমর্থন দেওয়া হলো এবং কোন কারণে বিরোধিতা করা হলো—তার রাজনৈতিক ব্যাখ্যাই গুরুত্বপূর্ণ। জামায়াতের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে সংসদে তাদের আচরণের ধারাবাহিকতা।
এদিকে জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি ও সংসদ সদস্য ড. মু. শফিকুল ইসলাম মাসুদের সম্প্রতি আলোচিত একটি খুতবার বক্তব্যেও সরকার ও বিরোধী দলের সম্পর্ক নিয়ে ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সেখানে তিনি সংসদে সরকারের সঙ্গে বিরোধিতা ও রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থে ঐক্যের কথাও তুলে ধরেন।
জামায়াতের নেতারা বলছেন, সরকারের ভুল ও জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা হবে। একই সঙ্গে দেশের স্বার্থে ভালো উদ্যোগে সহযোগিতাও করা হবে। তবে জনগণের অধিকার ও স্বার্থের প্রশ্নে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।
তাদের মতে, জনগণ এখন শুধু সরকারবিরোধী স্লোগান নয়, কার্যকর ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক ভূমিকা দেখতে চায়। তাই সরকারের ভুল তুলে ধরার পাশাপাশি বিকল্প নীতিগত প্রস্তাব দেওয়া এবং জাতীয় সংকটে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করাও বিরোধী দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বিভিন্ন বক্তব্যে বলেছেন, তারা জাতীয় পার্টির মতো ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ হতে চান না। বরং প্রকৃত অর্থে বিরোধী দলের দায়িত্ব পালন করতে চান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের সঙ্গে ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রেখেও জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক সংকট ও জনগণের মৌলিক স্বার্থের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য তৈরি করা সংসদীয় গণতন্ত্রের পরিণত আচরণের পরিচায়ক। ফলে জামায়াতের সামনে এমন একটি রাজনৈতিক অবস্থান তৈরির সুযোগ রয়েছে, যেখানে বিরোধিতা মানেই সংঘাত নয় এবং সহযোগিতা মানেই রাজনৈতিক আপস নয়।
তবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে সংশয়ও রয়েছে। বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, বর্তমান পর্যায়ে জামায়াতকে চূড়ান্ত কোনো রাজনৈতিক তকমা দেওয়ার সময় আসেনি। সংসদে দলটির ধারাবাহিক কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রাজপথের আন্দোলনের ক্ষেত্রেও সরকারের কাছ থেকে কীভাবে সুযোগ-সুবিধা আদায় করা যায়, সেটিই তাদের রাজনৈতিক কৌশলের অংশ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল হালিম বলেন, বিরোধী দল হিসেবে সরকারের ভালো কাজে সমর্থন থাকবে। তবে জনস্বার্থবিরোধী কর্মসূচির ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। রাজপথ ও সংসদ—দুই জায়গাতেই তারা প্রকৃত বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সারোয়ার জাহান বলেন, সরকার পতনের জন্য রাজপথে আন্দোলন বা সরকারবিরোধী বক্তব্য দেওয়াই বিরোধী দলের একমাত্র কাজ নয়। বরং সরকারকে কতটা জবাবদিহির মধ্যে রাখা যায়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি জাতীয় সংকট বা রাষ্ট্রীয় স্বার্থের প্রশ্নে সরকারের পাশে দাঁড়ানোর রাজনৈতিক পরিপক্বতাও বিরোধী দলের দায়িত্বের অংশ।
সব মিলিয়ে, সংসদ ও রাজপথ—দুই ক্ষেত্রেই সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বজায় রেখে জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার নীতি অনুসরণ করতে চাইছে জামায়াত। আগামী দিনে সংসদে তাদের ধারাবাহিক ভূমিকা এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিই এই অবস্থানের বাস্তব প্রতিফলন কতটা ঘটছে, তা নির্ধারণ করবে।