
ভারতের কলকাতায় নিউমার্কেটের কাছে মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শিশুসহ ৯ ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) মাঝরাতে লাগা আগুনে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। পরিচয় শনাক্ত হওয়া ছয়জনের মধ্যে পাঁচজন বাংলাদেশি এবং একজন ভারতের ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা। ভয়াবহ এই দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মুখ থেকে মা-বাবাকে নিয়ে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরেছেন বাংলাদেশি ডিজাইনার ও উদ্যোক্তা অনিক কুণ্ডু। রাতের সেই ভয়াল অভিজ্ঞতার কথা তিনি শেয়ার করেছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তার সেই ফেসবুক পোস্টটি কিছুটা সম্পাদনা করে নিচে তুলে ধরা হলো।
‘আপনারা বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজন যারা কলকাতা ভ্রমণে বা ডাক্তার দেখাতে এসেছেন, তাদের খোঁজ নিন। গতকাল (১৯ আগস্ট) রাত ২টায় মির্জা গালিব স্ট্রিট, নিউমার্কেট এলাকায় ফায়ার ব্রিগেডের পাশের বিল্ডিংয়ে আগুন লাগে।
উল্লেখ্য, এই বিল্ডিংসহ আশপাশের এলাকা বাংলাদেশ অধ্যুষিত (বাংলাদেশিরা কলকাতায় এলে সাধারণত এই এলাকায় বেশি থাকেন)। রাত ২টায় বিল্ডিংয়ের লবির দ্বিতীয় তলায় আগুন লাগে। আমরা তৃতীয় ফ্লোরে ছিলাম। আমি, বাবা, মা ও পাশের রুমের এক দম্পতি, তাদের বাচ্চা এবং আরও এক ভাইসহ আমরা কয়েকজন বাংলাদেশি আটকে গিয়েছিলাম।
সিঁড়িতেও আগুনের প্রচণ্ড ধোঁয়া থাকায় আমরা কোনোভাবেই ছাদে যেতে বা নিচে নামতে পারছিলাম না। কোনোমতে বাথরুমের জানালা (ভেন্টিলেটর) খুলে ফায়ার সার্ভিসে কল দিয়ে জানাই যে আমরা চারতলায় আটকে আছি, আমাদের বাঁচান, আমরা নিশ্বাস নিতে পারছি না।
ইতিমধ্যে বিল্ডিংয়ের কাচ ও এসি ব্লাস্ট করতে থাকে। আগুন মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে আনার কিছুক্ষণ আগে ফায়ার সার্ভিসের লোকেরা আমাদের উদ্ধার করে নিচে নামাতে সক্ষম হয়। মৃত্যুকে খুব কাছে থেকে দেখেছি। যতদূর জানি, আমার চোখের সামনে ৩টি অ্যাম্বুলেন্সে মৃত ও আহতদের দেহ নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
এখন বিল্ডিংয়ে কাউকে ঢুকতে দিচ্ছে না। কোনো হোটেলেই কেউ জায়গা দিচ্ছে না। সারারাত বাইরে কাটিয়ে সকালে অন্য একটি হোটেলে উঠলাম। তবে অনেক মানুষ মারা গেছে। এর মাঝে পুরুষ, নারী, শিশুও আছে। অধিকাংশই বাংলাদেশি হতে পারে। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সাহায্যে আমার জিনিসপত্র একটু আগে বের করে এনে অন্য হোটেলে উঠেছি। আমরা সবাই শারীরিকভাবে সুস্থ আছি। ভগবানের অশেষ কৃপায় এ যাত্রায় বেঁচে গেছি।
বাথরুমে কাটানো প্রতি ন্যানো সেকেন্ডে মনে হচ্ছিল আমরা আর বাঁচব না। সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে চিকিৎসা করাতে এসে যেন মরতে এসেছি! সিঁড়ি ও লিফটে যেমন আগুনের স্ফুলিঙ্গ দেখেছি, তা মৃত্যুকে খুব কাছে থেকে দেখার চেয়ে কম কিছু না।
সবাই সুস্থ থাকুন। প্রতিটা শহর—ঢাকা হোক বা কলকাতা—যেন একটা মরণ বোমা। কোথাও যেন অগ্নিনির্বাপণের কোনো সঠিক ব্যবস্থা নাই। ব্যবসায়ীরা কি শুধু টাকাই কামিয়েই যাবে? মানুষের জীবনের মূল্য ঠিক কোথায়? আমাদের অনেকেরই অনেকের সঙ্গে হয়তো শেষ দেখা হয়ে গেছে। তাই যে যার সঙ্গে পারেন ভালো ব্যবহার করুন।’